বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং ‘নীর নির্মল পরিয়োজনা‘র অধীনে গৃহীত বৃহত্তর আলগাপুর–হাইলাকান্দি জল সরবরাহ প্রকল্প দীর্ঘ এক দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও আজও সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৫ সালে তৎকালীন আলগাপুরের বিধায়িকা মন্দিরা রায়ের হাত ধরে যে মেগা প্রকল্পের শিলান্যাস হয়েছিল, সেই প্রকল্প আজও অধরাই থেকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে আলগাপুর ও হাইলাকান্দি উন্নয়ন খণ্ডের অন্তর্গত ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের শতাধিক গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে।
প্রকল্পের আওতায় থাকা গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির মধ্যে আলগাপুর উন্নয়ন খণ্ডের অধীনে রয়েছে আলগাপুর, বাঁশবাড়ি, বকরিহাওর, চণ্ডিপুর, চিপরসঙ্গন, মোহনপুর, উত্তর নারায়নপুর, সৈয়দবন্ধ, উত্তর কাঞ্চনপুর ও পশ্চিম মোহনপুর গ্রাম পঞ্চায়েত।
অন্যদিকে হাইলাকান্দি উন্নয়ন খণ্ডের অধীনে রয়েছে ভাটিরকুপা, বোয়ালিপার, চাঁদপুর–উজানকুপা এবং গাংপার ধূমকর (লক্ষ্মীরবন্দ) গ্রাম পঞ্চায়েত। এই ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের এক লক্ষেরও বেশি মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাটাখাল নদীর জলকে পরিশোধন করে সরবরাহ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে বরাদ্দ ছিল ১০৫ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা। পরবর্তীকালে ঠিকাদারের দাবি অনুযায়ী আরও প্রায় ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৪০ কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে গেছে।
এই বিশাল মেগা পানীয় জল প্রকল্পের ঠিকাদারি পেয়েছিল দিল্লির এসএন এনভায়রো টেক নামের একটি সংস্থা। কিন্তু এতো বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরেও প্রকল্পটি আজও অসম্পূর্ণ, যা স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই প্রকল্পের কারণে আরও একটি বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন এলাকাবাসী। বরাক উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি হিফজুর রেহমান লস্কর জানিয়েছেন, প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকার কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘জল জীবন মিশন‘ প্রকল্পটি এই এলাকায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, যেসব এলাকায় ইতিমধ্যে কোনো জল সরবরাহ প্রকল্প চলমান রয়েছে, সেখানে সমান্তরালভাবে আরেকটি প্রকল্প চালু করা যায় না। ফলে একদিকে পুরনো প্রকল্প অসম্পূর্ণ অবস্থায় বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে, অন্যদিকে নতুন কোনো বিকল্প প্রকল্পও চালু না হওয়ায় বিশুদ্ধ পানীয় জলের চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। দুই প্রকল্পের মাঝখানে পড়ে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ গ্রামবাসীরা।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র আরও হতাশাজনক। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত বহু গ্রামে এখনও পাইপলাইন সংযোগের কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। কোথাও জলাধার বা ওভারহেড রিজার্ভার নির্মাণকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সাধারণ গ্রামবাসীরা বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে ১৪০ কোটিরও বেশি টাকার এই মেগা প্রকল্প কার্যত একটি সাদা হাতিতে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয় মহলে মন্তব্য উঠছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে বর্ষাকালে। এলাকার বাসিন্দাদের বক্তব্য, বর্ষার মৌসুমে দূষিত জল ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস-সহ বিভিন্ন জলবাহিত রোগের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে। বহু পরিবার এখনও অস্বাস্থ্যকর পুকুর, খাল কিংবা নলকূপের জলের উপর নির্ভরশীল হয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
গ্রামবাসীরা দ্রুত প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীদের নতুন ভরসার কেন্দ্র হয়ে উঠেছেন সদ্য নির্বাচিত আলগাপুর–কাটলীছড়া কেন্দ্রের তরুণ বিধায়ক জুবাইর এনাম। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রাক্তন বিধায়ক নিজামুদ্দিন চৌধুরী এই বিষয়টি নিয়ে কখনও তেমন আগ্রহ দেখাননি এবং প্রকল্পটির অগ্রগতির জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করেননি। সেই কারণেই এবার গ্রামবাসীরা জুবাইর এনামের উপর ভরসা রাখছেন এবং তাঁর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে হাইলাকান্দি জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার এ এইচ মজুমদার জানিয়েছেন, এই অতি প্রত্যাশিত প্রকল্পের কাজ বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারের চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণেই মেগা প্রকল্পটি এভাবে থমকে গেছে বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতিতে বিভাগ ঠিকাদার পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং অবহেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থাকে ব্ল্যাকলিস্টভুক্ত করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রশাসনের তরফে প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পূর্ণ করার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ২০১৫ সালে শিলান্যাস হওয়া একটি প্রকল্প এক দশক পরেও অসম্পূর্ণ থাকা এবং ১৪০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষের ঘরে জল না পৌঁছানো— এই প্রশ্নগুলো এখন গোটা এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এখন সকলের নজর এই দিকেই যে, বহু প্রতীক্ষিত এই বৃহৎ জল সরবরাহ প্রকল্প আদৌ কবে বাস্তবে রূপ নেবে এবং ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের শতাধিক গ্রামের এক লক্ষেরও বেশি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন কবে পূরণ হবে।